রাজ্যের সরকারি কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান ঘটতে চলেছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী স্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছেন যে তাঁর সরকার চলতি অর্থবর্ষের মধ্যেই রাজ্যে সপ্তম বেতন কমিশন (7th Pay Commission) বাস্তবায়িত করবে । এই ঘোষণার মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই রাজ্য সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে সপ্তম বেতন কমিশন গঠন করে বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে । এ বিষয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, আমরা এই অর্থবর্ষের মধ্যে সপ্তম বেতন কমিশন চালু করার চেষ্টা করছি । এর আগে গত মে মাসে নবান্নে মন্ত্রিসভার বৈঠকে এই কমিশন গঠনের নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল, যা এখন চূড়ান্ত রূপ পেয়েছে ।
বকেয়া ডিএ পরিশোধ ও কমিশনের কাজের পরিধি
কেবল বেতন কাঠামোই নয়, কর্মীদের দীর্ঘদিনের বকেয়া মহার্ঘ ভাতা (DA) পরিশোধের বিষয়েও আশ্বাস দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী । তিনি বলেন, কেন্দ্র ও রাজ্যের ডিএ-র মধ্যে ব্যবধান আমরা ধীরে ধীরে কমিয়ে আনব। কেউ হয়তো এক লাফে ৪২% ডিএ ঘোষণার আশা করেছিলেন, কিন্তু আমরা তা করিনি। আমরা সতর্কতার সাথে গণনা করে এই ব্যবধান ধীরে ধীরে পূরণ করব । এর আগে গত ২২শে জুন রাজ্যের প্রথম বাজেটে ২০ শতাংশ পয়েন্ট ডিএ বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, যার ফলে রাজ্য কর্মীদের ডিএ দাঁড়িয়েছে ৩৮%-এ । এই পদক্ষেপে কেন্দ্রীয় কর্মীদের সঙ্গে ডিএ-র ব্যবধান ৪২% থেকে কমে ২২%-এ নেমে এসেছে, যা একটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি ।
নতুন গঠিত সপ্তম বেতন কমিশনের মূল দায়িত্ব হবে রাজ্য সরকারি কর্মচারী, পেনশনভোগী এবং সরকারি সহায়তাপ্রাপ্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের বেতন, ভাতা ও পেনশন পুনর্বিবেচনা করা । কমিশন মূল বেতন, মহার্ঘ ভাতা (DA), যাতায়াত ভাতা, পদোন্নতির নীতি এবং কর্মীদের কাজ-জীবনের ভারসাম্য (Work-life balance) সহ বিভিন্ন বিষয়ে সুপারিশ পেশ করবে । পঞ্চায়েত, পুরসভা, সরকারি সংস্থা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কর্মীরাও এই কমিশনের আওতায় আসবেন ।
কমিশনের গঠন ও সময়সীমা
পশ্চিমবঙ্গ সরকার গঠিত এই বিশেষজ্ঞ কমিটির নেতৃত্ব দেবেন ভারতের অর্থ মন্ত্রকের অর্থনৈতিক বিষয়ক দফতরের প্রাক্তন সচিব ও অবসরপ্রাপ্ত আইএএস অফিসার অতনু চক্রবর্তী । কমিটির অন্যান্য সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চের সিনিয়র ফেলো ড. পার্থ মুখোপাধ্যায় এবং আইআইএম কলকাতার অর্থনীতির অধ্যাপক ড. পার্থ প্রতিম পাল । পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অর্থ দফতরের সচিব দেবী প্রসাদ করণম এই কমিশনের সদস্য-সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন ।
এই কমিশনকে আগামী ছয় মাসের মধ্যে রাজ্য সরকারের কাছে তাদের প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে । প্রয়োজনে কমিশন অন্তর্বর্তীকালীন রিপোর্টও পেশ করতে পারবে। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য, রাজ্যে সপ্তম বেতন কমিশন গঠনের দাবিটি দীর্ঘদিনের ছিল। নির্বাচনী ইশতেহারে এই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বিজেপি, এবং ক্ষমতায় আসার পর সরকার সেই প্রতিশ্রুতি পূরণের দিকে এগিয়েছে ।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও কর্মীদের প্রতিক্রিয়া
উল্লেখ্য, পূর্ববর্তী মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমলেও এই বিষয়ে আলোচনা হয়েছিল। গত মার্চ মাসে তিনি আরওপিএ ২০০৯-এর আওতায় বকেয়া ডিএ পরিশোধের ঘোষণা দিয়েছিলেন । তবে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে ২০২৬ সালের ৩১শে মার্চের মধ্যে সেই বকেয়ার ২৫% পরিশোধের কথা বলা হয়েছিল । নতুন সরকার এসে এখন সেই বকেয়া পরিশোধের পাশাপাশি সম্পূর্ণ নতুন বেতন কাঠামো চালু করার উদ্যোগ নিয়েছে, যা রাজ্য কর্মচারী মহলে ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে ।
রাজ্য সরকারি কর্মচারী সংগঠন সংগ্রামী যৌথ মঞ্চ এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে। সংগঠনের নেতারা বলেছেন, দীর্ঘদিনের আন্দোলনের পর এই সিদ্ধান্ত তাদের সংগ্রামের স্বীকৃতি । তবে তারা আশা করছেন, কেন্দ্রীয় কর্মীদের সঙ্গে ডিএ-র ব্যবধান সম্পূর্ণ মেটাতে সরকার আরও পদক্ষেপ নেবে। এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত, কমিশন গঠনের ফলে রাজ্যের প্রায় ৬ লক্ষ শূন্যপদ পূরণের প্রক্রিয়াও ত্বরান্বিত হবে বলে মনে করছেন কর্মী সংগঠনের নেতারা ।
এখন দেখার বিষয়, আগামী ছয় মাসের মধ্যে এই কমিশন কী ধরনের সুপারিশ পেশ করে এবং তা রাজ্যের আর্থিক পরিস্থিতি ও কর্মীদের জীবনযাত্রায় কী প্রভাব ফেলে। তবে এই মুহূর্তে এই ঘোষণা রাজ্যের লক্ষ লক্ষ সরকারি কর্মী ও পেনশনভোগীদের জন্য নতুন আশার সঞ্চার করেছে।





