দক্ষিণ ২৪ পরগনার আমতলায় শনিবার সকাল থেকেই ছিল থমথমে পরিবেশ। পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর কড়া ঘেরাটোপের মধ্যে জেলা প্রশাসন শুরু করে তৃণমূল কংগ্রেসের জাতীয় সাধারণ সম্পাদক তথা ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি পার্টি অফিস ভাঙার কাজ। আমতলা-বারুইপুর রোডের ধারে অবস্থিত পাঁচতলা এই ভবনটি তৃণমূলের ডায়মন্ড হারবার সাংগঠনিক এলাকার একটি গুরুত্বপূর্ণ কার্যালয় হিসেবে পরিচিত ছিল এবং ভোটের ফল প্রকাশের পর থেকে এটি বন্ধই ছিল বলে জানা গেছে।
প্রশাসনের বক্তব্য অনুযায়ী, এই ভবনটি কোনও অনুমোদিত বিল্ডিং প্ল্যান ছাড়াই এবং স্থানীয় পুরসভা বা পঞ্চায়েতের নির্মাণ বিধি লঙ্ঘন করে তৈরি করা হয়েছিল। জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যাচ্ছে, ভবনটির বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ পাওয়ার পরই গত ১৫ জুলাই সংশ্লিষ্ট পক্ষকে শুনানিতে হাজির হওয়ার জন্য নোটিস পাঠানো হয়েছিল। বারবার নোটিস পাঠানোর পরেও উপযুক্ত জবাব না মেলায় আইন অনুযায়ী উচ্ছেদ প্রক্রিয়া শুরু করা হয় বলে দাবি প্রশাসনের একাংশের। শনিবার দুপুরের দিকে তিনটি বুলডোজার এনে প্রথমে অফিসের সামনের শেড এবং পরে মূল কাঠামোর সামনের অংশ ভাঙার কাজ শুরু হয়।
ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় তীব্র ভাষায় পুলিশ-প্রশাসনের সমালোচনা করেছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তিনি এই ঘটনাকে "পোশাকি চুরি" বলে আখ্যা দিয়ে অভিযোগ করেন, যাঁরা আইন রক্ষার দায়িত্বে থাকার কথা, তাঁরাই এখন আইনভঙ্গকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। তাঁর দাবি, উচ্ছেদের সময় পুলিশের উপস্থিতিতেই কার্যালয় থেকে ল্যাপটপ, প্রিন্টার, গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র ভর্তি ট্রাংক এবং আসবাবপত্র লুট করা হয়েছে। বিষয়টি বর্তমানে কলকাতা হাইকোর্টের বিবেচনাধীন থাকা সত্ত্বেও এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে তিনি একে আদালত অবমাননার শামিল বলেও উল্লেখ করেছেন।
অভিষেকের অভিযোগ, এই গোটা ঘটনার পেছনে রয়েছে বিজেপির ইন্ধন। তিনি এই পদক্ষেপকে বিজেপির "বুলডোজার রাজনীতি" বলে কটাক্ষ করে বলেন, প্রথমে অন্নপূর্ণা যোজনা নিয়ে বিতর্ক তৈরি করা হয়েছিল, আর ভোট মিটতেই এবার শুরু হয়েছে বুলডোজার। দল হিসেবে তৃণমূল কংগ্রেসের কোনও আপত্তি নেই যদি সরকারি জমি বেআইনিভাবে দখল করা কোনও রাজনৈতিক সংগঠনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়, কিন্তু এই কার্যালয়টি সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত মালিকানাধীন জমিতে, প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও বৈধ নথিপত্র নিয়েই তৈরি হয়েছিল বলে তাঁর দাবি। প্রয়োজনে সমস্ত নথি কলকাতা হাইকোর্টের সামনে পেশ করার কথাও তিনি জানিয়েছেন।
অন্যদিকে প্রশাসনের এক পদস্থ আধিকারিক জানিয়েছেন, অভিযোগ পাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতেই সম্পূর্ণ আইনি প্রক্রিয়া মেনে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং এর সঙ্গে রাজনীতির কোনও সম্পর্ক নেই। স্থানীয় আমতলার বিজেপি বিধায়ক অগ্নিশ্বর নস্কর প্রশাসনের এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, কাঠামোটি বেআইনিভাবে তৈরি হয়েছিল এবং প্রশাসন শেষ পর্যন্ত আইন মেনেই ব্যবস্থা নিয়েছে। উচ্ছেদের সময় ঘটনাস্থলে জড়ো হওয়া বিজেপি কর্মী-সমর্থকদের উল্লাস ও স্লোগান দিতেও দেখা গেছে।
রাজনৈতিকভাবে উত্তপ্ত এই পরিস্থিতিতে তৃণমূল কংগ্রেসের তরফে স্পষ্ট জানানো হয়েছে, প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে দ্রুত কলকাতা হাইকোর্টে জরুরি শুনানির আবেদন জানানো হবে, প্রয়োজনে সুপ্রিম কোর্টেও যাওয়া হতে পারে। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, যাঁরা এই ঘটনায় ভিডিওতে ধরা পড়েছেন, তাঁরা আইনি ব্যবস্থা থেকে রেহাই পাবেন না। পাশাপাশি তিনি ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করে বলেন, প্রতিটি ক্রিয়ারই সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া থাকে, এবং ২০৩১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পর যদি তিনি বেঁচে থাকেন, তাহলে একই আইনের মাধ্যমে এর সুদে-আসলে জবাব দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ এই মন্তব্যকে ভবিষ্যতে আরও বড় রাজনৈতিক সংঘাতের ইঙ্গিত হিসেবেই দেখছেন।
সব মিলিয়ে আমতলার এই ঘটনা নিছক একটি পুরসভা বা প্রশাসনিক উচ্ছেদ অভিযানের গণ্ডি পেরিয়ে রাজ্য রাজনীতিতে নতুন উত্তেজনার জন্ম দিয়েছে। প্রশাসন যেখানে একে নিয়মমাফিক ও রাজনীতি-নিরপেক্ষ পদক্ষেপ বলে দাবি করছে, সেখানে তৃণমূল কংগ্রেস একে বিজেপি-প্রশাসনের যৌথ চক্রান্ত হিসেবেই তুলে ধরছে। বিষয়টি এখন আদালতের গণ্ডিতে গড়ানোয়, কলকাতা হাইকোর্ট এই মামলায় কী রায় দেয়, রাজ্য রাজনীতির নজর এখন সেদিকেই।





