চীনের হাংঝৌতে অনুষ্ঠিত আইএসএসএফ শুটিং ওয়ার্ল্ড কাপে মহিলাদের ২৫ মিটার পিস্তল ইভেন্টে নজিরবিহীন সাফল্য পেল ভারতীয় শ্যুটিং। তরুণ শুটার Esha Singh ফাইনালে দুরন্ত পারফরম্যান্স করে সোনার পদক জিতেছেন আর দুইবারের অলিম্পিক পদকজয়ী মনু ভাকের লড়াই করে ব্রোঞ্জ নিশ্চিত করেছেন। একই ইভেন্টে একই সঙ্গে দুই ভারতীয়র পডিয়ামে ওঠা শুধু দিনের সেরা খবরই নয় দেশের মহিলা শ্যুটিং কাঠামোর শক্ত ভিতেরও স্পষ্ট প্রমাণ হয়ে উঠেছে।
হাংঝৌতে সোনাঝরা ফাইনাল
হাংঝৌ শ্যুটিং রেঞ্জে সোমবারের মহিলাদের ২৫ মিটার পিস্তল ফাইনাল শুরু থেকেই ছিল টানটান উত্তেজনায় ভরা। কোয়ালিফিকেশন পর্বে ধারাবাহিকতা বজায় রেখে ফাইনালে জায়গা করে নেন এষা ও মনু দু'জনেই বর্তমান ভারতীয় শ্যুটিংয়ের দুই প্রজন্মের প্রতীক। ফাইনাল রাউন্ডে ৫০ শটের মধ্যে ৪০ পয়েন্ট সংগ্রহ করে Esha Singh শীর্ষে শেষ করেন চীনের অভিজ্ঞ শুটার ঝাং ইউইকে স্পষ্ট ব্যবধানে পিছনে ফেলেন তিনি। অন্যদিকে উত্তর কোরিয়ার হিয়ন গিয়ং পাক-এর বিরুদ্ধে ডাবল শুট-অফ জিতে ব্রোঞ্জ নিশ্চিত করেন মনু ভাকের যা ফাইনালের নাটকীয়তা আরও বাড়িয়ে দেয়।
অলিম্পিক পদকজয়ীর উপরে নতুন তারকার উত্থান
ভারতীয় শ্যুটিং ভক্তদের কাছে এই ইভেন্টের অন্যতম বড় আকর্ষণ ছিল মনু ভাকের বনাম Esha Singh-এর অভ্যন্তরীণ প্রতিদ্বন্দ্বিতা। অলিম্পিক্সে জোড়া পদক জয়ী মনু ইতিমধ্যেই বিশ্বস্তরে প্রতিষ্ঠিত নাম আর মাত্র ২১ বছর বয়সে একের পর এক সাফল্যে উঠতি তারকা হিসেবে আলোচনায় এষা। আগে মিউনিখ ওয়ার্ল্ড কাপে মহিলাদের ২৫ মিটার পিস্তলে ওয়ার্ল্ড রেকর্ড গড়ে সোনা জিতে নিজের সম্ভাবনার প্রমাণ রেখেছিলেন এষা সেখানে ফাইনালে উঠতেই পারেননি মনু। হাংঝৌতে সেই ব্যবধান অনেকটাই কমালেও ফাইনাল র্যাঙ্কিংয়ে আবারও এগিয়ে গেলেন তরুণ শুটার এই ম্যাচআপ কার্যত ভারতের শ্যুটিং দুনিয়ায় নতুন প্রজন্ম বনাম অভিজ্ঞতার এক প্রতীকী লড়াই হয়ে উঠল।
ইন্ডিয়া শুটিংয়ের গর্ব
এই ইভেন্টে ভারতের জন্য ডাবল পডিয়াম ফিনিশ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। দেশের জন্য চলতি আইএসএসএফ ওয়ার্ল্ড কাপের এটি প্রথম গোল্ড মেডেল যার সঙ্গে যুক্ত হল মনুর ব্রোঞ্জের অতিরিক্ত ঝলক। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় একই ইভেন্টে দুই ভারতীয়র পডিয়ামে থাকা ভারতীয় কন্টিনজেন্টের ডেপথ এবং বেঞ্চ স্ট্রেংথের দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে। ফাইনাল শেষে কোচিং স্টাফরা জানান প্যারিস অলিম্পিক্সের পর নতুন করে গড়ে ওঠা ট্রেইনিং মডিউল স্পোর্টস সায়েন্স-ভিত্তিক প্রস্তুতি এবং ধারাবাহিক আন্তর্জাতিক এক্সপোজার এই ফলাফলের মূল ভিত্তি।
Esha Singh: ধারাবাহিক সাফল্যের গল্প
হায়দরাবাদের শুটার Esha Singh-এর উত্থান কোনও আকস্মিক গল্প নয়। ২০১৮ সালে মাত্র ১৩ বছর বয়সে ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়নশিপে ১০ মিটার এয়ার পিস্তল ইভেন্টে সোনা জিতে তিনি জাতীয় শ্যুটিং মহলে আলোড়ন তুলেছিলেন যেখানে মনু ভাকের ও হিনা সিধুর মতো প্রতিষ্ঠিত নামদেরও পিছনে ফেলেছিলেন। এরপর এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ থেকে শুরু করে একাধিক ওয়ার্ল্ড কাপ মঞ্চে পডিয়াম ফিনিশ করে নিজেকে নিয়মিত কন্টেন্ডার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন তিনি। ২০২৬ সালের মিউনিখ আইএসএসএফ ওয়ার্ল্ড কাপে মহিলাদের ২৫ মিটার পিস্তলে ৪৩/৫০ স্কোর করে ওয়ার্ল্ড রেকর্ড গড়া এবং তার কয়েক মাসের মধ্যেই হাংঝৌতে আবারও গোল্ড জেতা এই ধারাবাহিকতা এষাকে বর্তমানে মহিলা পিস্তল শুটিংয়ের শীর্ষ সারির নাম করে তুলেছে।
অভিজ্ঞতার ঝুলি ও প্রত্যাবর্তনের বার্তা
অন্যদিকে অলিম্পিক পদকজয়ী মনু ভাকেরের ব্রোঞ্জও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। গত কয়েক মরশুমে ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপের মতো বড় মঞ্চে ব্যক্তিগত ইভেন্টে ব্যর্থতার জন্য সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন তিনি তবে দলগত সাফল্যে ছিলেন ধারাবাহিক। হাংঝৌর এই পডিয়াম ফিনিশ মনুর জন্য আত্মবিশ্বাস ফেরানোর বড় প্ল্যাটফর্ম হিসেবে দেখা হচ্ছে বিশেষত যখন নতুন প্রজন্মের শুটারদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় তাঁকে ক্রমাগত নিজের জায়গা প্রমাণ করতে হচ্ছে। ডাবল শুট-অফের মতো চাপের পরিস্থিতিতে ব্রোঞ্জ নিশ্চিত করা তাঁর মানসিক দৃঢ়তা এবং বড় ম্যাচের টেম্পারামেন্টেরই প্রমাণ।
প্যারিস-পরবর্তী ভারতীয় শ্যুটিংয়ের ব্লুপ্রিন্ট
হাংঝৌ শুটিং ওয়ার্ল্ড কাপে Esha Singh-এর গোল্ড এবং মনু ভাকেরের ব্রোঞ্জ শুধু একটি টুর্নামেন্টের ফল নয় বরং প্যারিস অলিম্পিক্স-পরবর্তী ভারতীয় শ্যুটিংয়ের এক নতুন ব্লুপ্রিন্টের প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে। জুনিয়র স্তর থেকে সিস্টেমেটিক ট্যালেন্ট পাইপলাইন ফরেন এক্সপোজার ক্যাম্প হাই-পারফরম্যান্স সেন্টার এবং স্পোর্টস সাইকোলজি সব মিলিয়ে মহিলা পিস্তল স্কোয়াড এখন বিশ্বের অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী গ্রুপ হিসেবে উঠে এসেছে। মিউনিখের ওয়ার্ল্ড রেকর্ড হাংঝৌর ডাবল পডিয়াম এই ধারাবাহিক সাফল্য বজায় রাখতে পারলে ইন্ডিয়া শুটিং আগামী ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপ এবং পরের অলিম্পিক সাইকেলেও মেডেল কন্টেন্ডার হিসেবে পথ চলবে বলে মনে করছে শ্যুটিং মহল।





