রাজ্যের অন্নপূর্ণা যোজনা ঘিরে উপভোক্তাদের মধ্যে নতুন করে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। প্রকল্পের যোগ্যতার শর্তে সাম্প্রতিক পরিবর্তনের জেরে একাংশ উপভোক্তার মনে প্রশ্ন উঠেছে, ইতিমধ্যে হাতে পাওয়া অর্থ ভবিষ্যতে সরকারকে ফেরত দিতে হবে কিনা। পাশাপাশি বৈষম্যের অভিযোগও উঠছে বহু প্রকৃত অভাবী পরিবার এখনও প্রকল্পের সুবিধা থেকে বঞ্চিত, অথচ তুলনামূলক স্বচ্ছল পরিবারের একাংশ নিয়মিত অর্থ পাচ্ছেন বলে অভিযোগ। পরিস্থিতি স্পষ্ট করতে প্রয়োজন প্রকল্পের নিয়মে ঠিক কী কী পরিবর্তন এসেছে, তার বিস্তারিত পর্যালোচনা।
সূত্রের খবর, গত ৭ আগস্ট অন্নপূর্ণা যোজনার পোস্ট-বেনিফিট ডিস্ট্রিবিউশন সংক্রান্ত একটি পর্যালোচনা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকে প্রথমবার আবেদনকারীর পরিবারের সদস্যদের আয়ের প্রসঙ্গ উত্থাপিত হয়। আলোচনায় জানানো হয়, আবেদনকারীর স্বামী বা শ্বশুর যদি সরকারি চাকরি, সরকারি পেনশন অথবা আয়কর প্রদানের সঙ্গে যুক্ত থাকেন, তাহলে সংশ্লিষ্ট মহিলা প্রকল্পের সুবিধা পাবেন না। একই সঙ্গে আশাকর্মী, সিভিক ভলান্টিয়ার এবং প্যারা-টিচার পদে কর্মরত মহিলাদেরও তালিকা থেকে বাদ রাখার প্রস্তাব ওঠে। তবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এটি কোনও প্রকাশিত সরকারি বিজ্ঞপ্তি বা নির্দেশিকা নয় এটি একটি অভ্যন্তরীণ পর্যালোচনা বৈঠকের আলোচ্যসূচি, যা বিভিন্ন প্রশাসনিক প্রশ্নোত্তরের ভিত্তিতে প্রস্তুত হয়েছিল।
এই পরিবর্তনের প্রেক্ষাপট বুঝতে গেলে ফিরে তাকাতে হবে প্রকল্পের সূচনালগ্নে। গত ১৯ মে, ২০২৬ তারিখে জারি হওয়া মূল সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে যোগ্যতার শর্ত ছিল ব্যক্তিকেন্দ্রিক। সেখানে বলা হয়েছিল, আবেদনকারীর বয়স ২৫ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে হতে হবে, তিনি নিজে সরকারি চাকরিজীবী বা পেনশনভোগী হবেন না এবং নিজে আয়কর প্রদান করবেন না। পরিবারের অন্য কোনও সদস্যের পেশা বা আয় সংক্রান্ত কোনও শর্ত সেই বিজ্ঞপ্তিতে ছিল না। এই কারণে মে মাসের শেষ ভাগ ও জুন মাসের প্রথম দিকে আবেদনকারীদের একটি বড় অংশ জুলাই মাসে নির্বিঘ্নে অর্থ পেয়ে যান।
প্রশাসনিক সূত্রে জানা যাচ্ছে, জুলাইয়ের ১ তারিখে যাঁরা অর্থ পেয়েছেন অথচ যাঁদের পরিবারে সরকারি চাকরি বা পেনশনের সঙ্গে যুক্ত সদস্য রয়েছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে দুটি পৃথক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। একটি অংশ আবেদনপত্রে স্বামীর প্রকৃত পেশা গোপন করে ভুল তথ্য দিয়েছিলেন যেমন সরকারি চাকরিকে ব্যবসা বা কৃষিকাজ হিসেবে দেখানো হয়েছে। এই ধরনের ক্ষেত্রে মিথ্যা তথ্য দিয়ে সুবিধা গ্রহণের অভিযোগ ন্যায্য বলেই মনে করা হচ্ছে। অন্যদিকে দ্বিতীয় একটি অংশ আবেদনপত্রে স্বামীর সরকারি চাকরির তথ্য স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছিলেন, তা সত্ত্বেও আবেদন গৃহীত হয়ে অর্থ বিতরণ হয়েছে। প্রশাসনিক পর্যবেক্ষকদের একাংশের মতে, এক্ষেত্রে দায় শুধু আবেদনকারীর নয় যাচাইকারী আধিকারিকের ভূমিকাও প্রশ্নের মুখে পড়ছে।
আরও পড়ুন -২২ জুলাই লাইভ হচ্ছে যুবশক্তি পোর্টাল আবেদন করার এ টু জেড গাইডলাইন
এখনও পর্যন্ত সরকারের তরফে এমন কোনও আনুষ্ঠানিক নির্দেশিকা জারি হয়নি, যাতে বলা হয়েছে নিয়ম পরিবর্তনের ফলে পূর্বে বিতরণ হওয়া অর্থ ফেরত নেওয়া হবে। ৭ আগস্টের আলোচনায় মূলত ভবিষ্যতে যোগ্যতা যাচাই প্রক্রিয়া কীভাবে পরিচালিত হবে, তা নিয়েই আলোচনা হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। পূর্বে বিতরণ হওয়া অর্থ ফেরত নেওয়ার প্রসঙ্গ সরাসরি এই আলোচনায় উত্থাপিত হয়নি। ফলে বর্তমান পরিস্থিতিতে অর্থ ফেরতের কোনও আইনি বাধ্যবাধকতা নেই বলে মনে করা হচ্ছে, যদিও ভবিষ্যতে পৃথক কোনও নির্দেশিকা প্রকাশের সম্ভাবনা সম্পূর্ণ উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, এই পরিস্থিতিতে উপভোক্তাদের সতর্ক থাকা প্রয়োজন। প্রাপ্ত অর্থ আপাতত ব্যয় না করে সংরক্ষণ করে রাখাই বিচক্ষণতার পরিচয় বলে মনে করা হচ্ছে। উল্লেখ্য, কেন্দ্রীয় পিএম কিষান সম্মান নিধি প্রকল্পের ক্ষেত্রেও অতীতে একই ধরনের পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল, যেখানে প্রাথমিক বিতরণের পর অযোগ্য উপভোক্তাদের কাছ থেকে অর্থ ফেরত নেওয়ার নির্দেশিকা জারি হয়। অন্নপূর্ণা যোজনার ক্ষেত্রেও ভবিষ্যতে অনুরূপ নির্দেশিকা এলে, তা প্রতিপালন ছাড়া উপায় থাকবে না বলে ধারণা করা হচ্ছে। আগস্ট মাস থেকে যোগ্যতা যাচাই প্রক্রিয়া কার্যকর হওয়ার কথা থাকায়, যে সমস্ত পরিবারে সরকারি চাকরি বা আয়কর সংক্রান্ত তথ্য উঠে আসবে, তাঁদের আগামী মাসগুলির কিস্তি স্থগিত হওয়ার সম্ভাবনা প্রশাসনিক মহলে জোরালো হয়ে উঠেছে।
সব মিলিয়ে প্রশাসনিক সূত্রের বক্তব্য অনুযায়ী, অন্নপূর্ণা যোজনার যোগ্যতার মাপকাঠি সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হলেও, অর্থ ফেরত সংক্রান্ত প্রশ্নে এখনও কোনও আনুষ্ঠানিক সরকারি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়নি। উপভোক্তাদের প্রতি পরামর্শ, অহেতুক উদ্বিগ্ন না হয়ে সরকারি ঘোষণার অপেক্ষা করাই শ্রেয়, এবং নির্দিষ্ট নির্দেশিকা প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত প্রাপ্ত অর্থ সংরক্ষিত রাখা বাঞ্ছনীয়।





