উত্তরবঙ্গ সফরে এসে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা নিয়ে অন্যতম বড় প্রশাসনিক বার্তা দিয়েছেন। জুলাই মাসে যেসব যোগ্য মহিলা ও পরিবার এখনও অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা পাননি, তাঁদের জন্য স্পষ্ট আশ্বাস দিয়েছেন তিনি আগামী আগস্ট মাসে চলমান ভেরিফিকেশন শেষ হলে এবং সর্বোচ্চ ৩০ আগস্টের মধ্যে যাঁরা যোগ্য বলে প্রমাণিত হবেন, তাঁদের নাম সরকারি পোর্টালে নথিভুক্ত হয়ে যাবে এবং ভাতা তাঁদের অ্যাকাউন্টে পৌঁছে যাবে। অর্থাৎ, দফতরের ভাষায় এখন পুরো প্রক্রিয়াটি মূলত ভেরিফিকেশন ও এনরোলমেন্ট পর্যায়, যার পর যোগ্য আবেদনকারীদের জন্য পেমেন্ট সাইকেল স্বাভাবিক ভাবে চলবে।
জুন মাসে প্রথম দফায় প্রায় ২৭ লক্ষের কিছু বেশি অ্যাকাউন্টে তিন হাজার টাকা করে পাঠানো হয়েছিল, জুলাইয়ে দ্বিতীয় দফায় আরও বহু মহিলার অ্যাকাউন্টে অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা জমা হয়েছে। কিন্তু যাঁরা এখনও টাকা পাননি, অথচ যোগ্যতার শর্ত পূরণ করেছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে মুখ্যমন্ত্রী নিজে পরিষ্কার করেছেন এখন নথি যাচাই চলছে, আগস্টে অনেক যোগ্য আবেদনকারীর টাকা যাবে।
কারা পাবেন অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা, কী চলছে এখন?
মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য অনুধাবন করলে স্পষ্ট হয়, অন্নপূর্ণা যোজনার পরিধি বিস্তৃত এবং আবেদনকারীর সংখ্যা বিশাল। তিনি আগেই জানিয়েছিলেন, এই কর্মসূচি সরকার হাতে নেওয়ার সময় হাতে সময় খুব কম ছিল। ৩ জুনের আগে প্রায় ১ কোটি ৬০ লক্ষ আবেদন পোর্টালে জমা পড়ে, যার মধ্যে থেকে ঝাড়াই বাছাই করে যোগ্যতার ভিত্তিতে সিলেকশন করতে হয়েছে।
বর্তমানে প্রশাসনের কাজ মূলত তিন স্তরে ভাগ করা যায়:
প্রথমত, আবেদনকারীদের নথি পরিচয়, বাসস্থান, ব্যাঙ্ক ডিটেইল, যোগ্যতার প্রমাণ যাচাই করা।
দ্বিতীয়ত, জাল বা অযোগ্য আবেদন (উদাহরণস্বরূপ, ভারতীয় নাগরিক নন বা আর্থিক মানদণ্ড পূরণ করেন না) বাদ দেওয়া।
তৃতীয়ত, যাঁরা সব শর্ত পূরণ করছেন, তাঁদের নাম চূড়ান্ত ভাবে পোর্টালে আপলোড করে পেমেন্ট অনুমোদন দেওয়া।
এই প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর যে সমস্ত যোগ্য আবেদনকারী রয়েছেন, তাঁদের সকলেই ধাপে ধাপে অন্নপূর্ণা যোজনার ভাতা পাবেন এ কথা মুখ্যমন্ত্রী একাধিক বার জোর দিয়ে বলেছেন।
পরিযায়ী শ্রমিকদের জন্য ১২৫ দিনের কাজের ঘোষণা
শুধু অন্নপূর্ণা যোজনা নয়, উত্তরবঙ্গ সফরে দাঁড়িয়ে মুখ্যমন্ত্রী পরিযায়ী শ্রমিকদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছেন। তাঁর ঘোষণা পরিযায়ী শ্রমিকরা এবার রাজ্যে ফিরতে শুরু করুন, সবাইকে জব কার্ড করে দেওয়া হবে, এবং বছরে ১২৫ দিনের কাজ নিশ্চিত করবে রাজ্য সরকার।
এই ঘোষণা মূলত গ্রামীণ কর্মসংস্থান ও সামাজিক সুরক্ষা দুটিকেই লক্ষ্য করে করা হয়েছে। যারা বহুদিন ধরে অন্য রাজ্যে কাজ করতে গিয়ে অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হচ্ছেন, তাঁদেরকে রাজ্যের ভেতরেই দীর্ঘমেয়াদি কাজ ও আয়ের নিশ্চয়তা দেওয়ার পরিকল্পনা করছে প্রশাসন। অন্নপূর্ণা যোজনা সহ অন্যান্য সামাজিক ভাতার পাশাপাশি এই ১২৫ দিনের কাজ ব্যবস্থা গ্রামীণ অর্থনীতিতে বাড়তি শক্তি যোগ করতে পারে।
CAA আবেদনকারী ও ট্রাইবুনাল কেস: ভাতা বন্ধ হবে না
অন্নপূর্ণা যোজনা ও অন্যান্য সামাজিক ভাতা নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বিশেষভাবে কথা বলেছেন সিএএ-তে আবেদনকারী এবং বিভিন্ন ট্রাইবুনালে নথি সংক্রান্ত মামলায় যুক্ত শরণার্থী পরিবারের প্রসঙ্গে। তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য, সরকারের টাকা ভারতীয় ছাড়া অন্য কেউ পেতে পারে না , তবে বাস্তব পরিস্থিতি মাথায় রেখে এই নীতির মধ্যে একটি মানবিক ছাড় রাখা হয়েছে।
যারা বাংলাদেশ থেকে শরণার্থী হিসাবে এসেছেন এবং সিএএ-তে আবেদন করেছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে যতদিন নাগরিকত্ব সংক্রান্ত প্রক্রিয়া নিষ্পত্তি না হচ্ছে, ততদিন তাঁদের সামাজিক ভাতা অন্নপূর্ণা যোজনা সহ চালু রাখা হবে, বন্ধ করা হবে না। একই ভাবে, যারা ট্রাইবুনালে নাগরিকত্ব সংক্রান্ত মামলায় আবেদন করেছেন, তাঁদের ক্ষেত্রেও যতক্ষণ না ট্রাইবুনাল তাঁদের আবেদন স্পষ্টভাবে বাতিল ঘোষণা করছে, ততদিন ভাতা বন্ধ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে শুভেন্দু সরকার।
এই ঘোষণা মূলত সীমান্তবর্তী ও অভিবাসী বাসিন্দা অঞ্চলে বসবাসকারী অসংখ্য পরিবারের মন থেকে একটি বড় অনিশ্চয়তার চাপ সরিয়ে দিতে পারে, যেখানে নাগরিকত্ব প্রশ্নের পাশাপাশি জীবিকা ও ন্যূনতম ভাতার নিরাপত্তাও বড় উদ্বেগের কারণ।
আয়ুষ্মান কার্ড, উত্তরবঙ্গের শিল্প ও কেন্দ্রের অনুদান
উত্তরবঙ্গে দাঁড়িয়ে মুখ্যমন্ত্রী আয়ুষ্মান কার্ড নিয়েও স্পষ্ট রূপরেখা দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, আয়ুষ্মান দিবসের দিন থেকেই কার্ড বিতরণ শুরু হবে অর্থাৎ স্বাস্থ্য সুরক্ষা প্রকল্পকে আরও বিস্তৃত পরিসরে কার্যকর করার পরিকল্পনা তৈরি।
একই সঙ্গে তিনি উত্তরবঙ্গের জন্য একাধিক প্রক্রিয়াকরণ শিল্পের কথা উল্লেখ করেছেন আম, আনারস, ভুট্টা সহ কৃষিজ পণ্য ভিত্তিক প্রসেসিং ইউনিট গড়ে তোলার প্রস্তাব ইতিমধ্যেই কাজের পর্যায়ে। এই শিল্প পরিকল্পনাকে তিনি উন্নয়নের অমৃতকাল হিসেবে বর্ণনা করেছেন এবং জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী চা শ্রমিক যোজনায় রাজ্য মোট ৩৩০ কোটি টাকার অনুদান পেয়েছে, যা উত্তরবঙ্গের চা উদ্যোগ ও শ্রমজীবী মানুষের আর্থিক সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
অন্নপূর্ণা যোজনার ক্ষেত্রে এখন সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন আগস্টে আসলেই কত জন নতুনভাবে টাকা পাবেন। মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণায় পরিষ্কার, ৩০ আগস্টের মধ্যে যোগ্যতার সব শর্ত পূরণকারী আবেদনকারীদের নাম পোর্টালে নথিভুক্ত হয়ে যাওয়ার কথা। তবে সংখ্যা অনুযায়ী কতজন সুবিধাভোগী যুক্ত হবেন, তার হিসেব জানতে অপেক্ষা করতে হবে মাসের শেষ পর্যন্ত।
একদিকে যেখানে প্রশাসন ভেরিফিকেশন, পোর্টাল আপডেট ও পেমেন্ট প্রসেসিং-এ ব্যস্ত, অন্যদিকে বহু সাধারণ পরিবার অপেক্ষা করছেন তাঁদের অ্যাকাউন্টে সেই ভাতা আসার দিনের। শেষ পর্যন্ত এই প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ ও দ্রুত হয়, এবং যোগ্য বলে দাবি করা প্রত্যেক পরিবারের হাতে সত্যিই অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা পৌঁছয় কি না আগামী আগস্ট সেপ্টেম্বর জুড়ে সেটাই নজরে রাখবে রাজ্যজুড়ে সংবাদমাধ্যম এবং নাগরিক সমাজ।





