নতুন দিল্লি, ২১ জুলাই: আজ রাজধানী দিল্লিতে রাজনৈতিক তাপমাত্রা চরমে পৌঁছেছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বাসভবনের সামনে বিক্ষোভ করতে গিয়ে কংগ্রেসের রাহুল গান্ধী, প্রিয়াঙ্কা গান্ধী বাদ্রা ও সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদব-সহ একাধিক বিরোধী নেতাকে গ্রেপ্তার করেছে দিল্লি পুলিশ। অন্যদিকে, Jantar Mantar-এ ককরোচ জনতা পার্টির (CJP) ডাকেও হাজার হাজার মানুষ জড়ো হয়েছেন শিক্ষার্থীদের পক্ষে প্রতিবাদ জানাতে। রাজধানীতে আজকের এই ঘটনাবলী দেশের রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
বিকেল প্রায় সাড়ে তিনটে নাগাদ কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধি দল প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বাসভবন 7, Lok Kalyan Marg-এর সামনে বিক্ষোভ শুরু করে। শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান-এর পদত্যাগ এবং সোমবারের ছাত্র আন্দোলনে পুলিশি নির্যাতনের প্রতিবাদে এই বিক্ষোভের আয়োজন করা হয়েছিল। কংগ্রেসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল যে তাঁরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি পেশ করতে চান, কিন্তু প্রশাসন তাঁদের অনুমতি দেয়নি। এরপরেই উত্তেজনা বেড়ে যায়।
রাহুল গান্ধী, প্রিয়াঙ্কা গান্ধী বাদ্রা এবং অখিলেশ যাদব বাসভবনের সামনে বসে পড়েন এবং সেখান থেকে সরতে অস্বীকৃতি জানান। তাঁদের সঙ্গে ছিলেন কংগ্রেসের অন্যান্য সিনিয়র নেতা ও সমাজবাদী পার্টির কয়েকজন বিধায়ক। বিক্ষোভকারীরা 'গৃহমন্ত্রী পদত্যাগ করুন', 'শিক্ষামন্ত্রী জবাব দাও', 'ছাত্রদের উপর নির্যাতন বন্ধ করো' ইত্যাদি স্লোগান দিতে থাকেন। পুরো এলাকায় পুলিশি বন্ধনী টানা হয় এবং যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়।
ঘন্টার পর ঘন্টা আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর দিল্লি পুলিশ ময়দানে নামে। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জিতেন্দ্র সিং এবং গৃহসচিব গোবিন্দ মোহন বিক্ষোভস্থলে গিয়ে রাহুল ও অন্যান্য নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। সরকারি সূত্রে জানানো হয়েছে, প্রশাসন বারবার আলোচনার মাধ্যমে পরিস্থিতি সমাধানের চেষ্টা করেছিল। কিন্তু এই আলোচনাও ব্যর্থ হয়। কংগ্রেসের দাবি ছিল প্রধানমন্ত্রী ও গৃহমন্ত্রীর পদত্যাগ এবং শিক্ষাব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ফেরানো, যা সরকারের পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব ছিল না। জিতেন্দ্র সিং অভিযোগ করেন, রাহুল গান্ধী প্রথমে শুধুমাত্র সংসদে আলোচনার দাবি জানালেও পরে তিনি শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের নতুন শর্ত জুড়ে দেন, যা সরকারের পক্ষে গ্রহণযোগ্য নয়।
প্রায় সন্ধ্যা সাতটার দিকে পুলিশ রাহুল, প্রিয়াঙ্কা ও অখিলেশকে আটক করে। দিল্লি পুলিশ জানিয়েছে, অনুমতি ছাড়া বিক্ষোভ এবং আইন-শৃঙ্খলা ভঙ্গের কারণে এই গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কংগ্রেসের মুখপাত্র পবন খেরা অভিযোগ করেন যে পুলিশ জানাচ্ছে না তাঁদের নেতাদের কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, "এটি একটি রাজনৈতিক প্রতিহিংসা। সরকার বিরোধী দলকে চুপ করাতে চাইছে।" তবে পুলিশ সূত্রে জানানো হয়েছে, আইন মেনেই সবকিছু করা হচ্ছে এবং নেতাদের নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখেই স্থানান্তরিত করা হয়েছে। রাহুল গান্ধীকে ছত্রসাল স্টেডিয়ামে, প্রিয়াঙ্কা গান্ধী বাদ্রাকে মন্দির মার্গ থানায় এবং অখিলেশ যাদবকে অন্য পুলিশ লাইনে নিয়ে যাওয়া হয়। অন্যান্য সাংসদদের Kingsway Camp-এ রাখা হয়েছে বলে জানা গেছে।
সোনিয়া গান্ধীর মন্দির মার্গ থানায় পদযাত্রা
মেয়ে প্রিয়াঙ্কাকে মন্দির মার্গ থানায় আটকে রাখা হয়েছে খবর পেয়ে কংগ্রেস সংসদীয় দলের সভাপতি সোনিয়া গান্ধী সন্ধ্যার পর সেখানে পৌঁছান। তিনি পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেখা করে মেয়ের মুক্তির জন্য জোর দাবি জানান। সোনিয়ার আগমনে থানার বাইরে জড়ো হওয়া কংগ্রেস কর্মীদের মধ্যে উৎসাহের সৃষ্টি হয়। তাঁরা 'সোনিয়া গান্ধী জিন্দাবাদ' এবং 'প্রিয়াঙ্কাকে মুক্ত করো' স্লোগান দিতে থাকেন।
সোনিয়া গান্ধী প্রায় আধঘণ্টা থানায় অবস্থান করেন এবং পুলিশ কমিশনারের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। তিনি জানান, নেতাদের গ্রেপ্তারের এহেন পদক্ষেপ গণতন্ত্রের প্রতি আঘাত। কিন্তু পুলিশ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে যে তাঁরা আইন অনুযায়ী কাজ করছেন এবং প্রিয়াঙ্কা গান্ধী-সহ সকল নেতাকে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে রাখা হয়েছে।
পরে সোনিয়া থানা ছেড়ে বেরিয়ে এলে কর্মীরা তাঁর গাড়ির পিছু নেন। কংগ্রেস সূত্রে জানা গেছে, সোনিয়া এই বিষয়ে শীর্ষ আইনি বিশেষজ্ঞদের সঙ্গেও পরামর্শ করেছেন এবং প্রয়োজনে উচ্চ আদালতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তবে সরকারি পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এবং রাজধানীতে যাতে অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে সেজন্যই প্রশাসন এই ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হয়েছে।
এদিকে, কংগ্রেসের পক্ষ থেকে আজ রাতেই একটি জরুরি বৈঠকের ডাক দেওয়া হয়েছে। দলীয় সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে এই বৈঠকে নেতাদের গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে আগামীকালের কর্মসূচি ঠিক করবেন বলে জানা গেছে। খাড়গে নিজেও সকাল থেকেই বিক্ষোভস্থলে ছিলেন এবং পুলিশের হাতে আটক হওয়া নেতাদের মধ্যে তিনিও ছিলেন। কিন্তু পরে তাঁকে মুক্তি দিলেও রাহুল, প্রিয়াঙ্কা ও অখিলেশকে আটক রাখা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, এঁদের বিরুদ্ধে আরও গুরুতর অভিযোগ থাকায় তাঁদের আটক রাখা হয়েছে।
Jantar Mantar-এ ফিরে ফিরে প্রতিবাদ
বিরোধী নেতাদের গ্রেপ্তারের মধ্যেই Jantar Mantar-এ CJP-র ডাকে হাজার হাজার মানুষ জড়ো হয়েছেন। গতকাল সোমবার 'চলো সংসদ' মার্চে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের পর আজ এই পুনরায় সমাবেশ হয়। CJP জানিয়েছে, পুলিশের লাঠিচার্জে আহত শিক্ষার্থীদের কথা মাথায় রেখে তারা আর সংসদে মার্চের পরিকল্পনা করছে না; এখন থেকে Jantar Mantar-এ অনির্দিষ্টকালের ধর্না দেওয়া হবে।
প্রতিবাদকারীদের একাংশ বলছেন, "পুলিশি নির্যাতন আমাদের সংকল্পকে আরও শক্তিশালী করেছে"। তারা সরকারের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের ওপর অত্যাচারের অভিযোগ এনেছেন এবং স্বচ্ছ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তবে প্রশাসনিক সূত্রে জানানো হয়েছে, Jantar Mantar-এ জড়ো হওয়া প্রতিবাদকারীদের মধ্যে অনেকেই উসকানিমূলক স্লোগান দিচ্ছেন যা আইন-শৃঙ্খলার জন্য হুমকি। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে অতিরিক্ত বাহিনী মোতায়েন করেছে।
CJP সমর্থকদের মধ্যে অনেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও গবেষক, যাঁরা বলেন যে চলমান শিক্ষানীতি শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নষ্ট করছে। আপ নেতা অরবিন্দ কেজরিওয়ালও Jantar Mantar-এ গিয়ে CJP সমর্থকদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, "শিক্ষার্থীদের আওয়াজ দমন করা যায় না। সরকার যতই চাপ দিক না কেন, সত্যের বিজয় হবে।" কেজরিওয়ালের আগমনে সমাবেশে নতুন উদ্যম আসে এবং প্রতিবাদকারীরা তাঁকে ঘিরে ধরে।
CJP-র প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে বলেন, "সরকার আমাদের সময় নষ্ট করেছে এবং কোনও সমাধান হয়নি। আমরা এখন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, আন্দোলন চলবে যতদিন না আমাদের দাবি পূরণ হচ্ছে।" তিনি আরও বলেন, রাহুল গান্ধী এবং অখিলেশ যাদবের গ্রেপ্তার প্রমাণ করে যে সরকার বিক্ষোভের ভয় পাচ্ছে। তবে সরকারি মুখপাত্র জানিয়েছেন, যে কোনও আইনি বিক্ষোভের অধিকার সবাইকে দেওয়া আছে, কিন্তু যখন তা আইনের সীমা লঙ্ঘন করে তখন প্রশাসনকে কঠোর পদক্ষেপ নিতেই হয়।
সোনাম ওয়াংচুককে স্থানান্তরের নির্দেশ
এদিকে, দিল্লি হাইকোর্ট সোনাম ওয়াংচুককে সফদরজং হাসপাতাল থেকে মেদান্ত হাসপাতালে স্থানান্তরের অনুমতি দিয়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে অনশনরত ওয়াংচুকের শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটায় তাঁর স্ত্রীর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এই নির্দেশ দেয় আদালত। ওয়াংচুক গত ৩৫ দিন ধরে অনশন করছেন এবং তাঁর স্বাস্থ্যের অবস্থা অত্যন্ত সংকটজনক বলে জানা গেছে।
আদালত এই নির্দেশ দেওয়ার সময় বলেন যে ওয়াংচুকের চিকিৎসার অধিকারকে গুরুত্ব দিয়েই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ওয়াংচুকের পরিবারের পক্ষ থেকে আদালতকে জানানো হয়েছিল যে সফদরজং হাসপাতালে পর্যাপ্ত চিকিৎসা ব্যবস্থা নেই। মেদান্ত হাসপাতালে নিয়ে গেলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে তাঁর চিকিৎসা সম্ভব হবে।
সার্বিক পরিস্থিতি ও প্রতিক্রিয়া
বর্তমানে দিল্লির একাধিক স্থানে পুলিশি বন্ধনী টানা হয়েছে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। কংগ্রেস ও সমাজবাদী পার্টির কর্মীরা বিভিন্ন থানার সামনে বিক্ষোভ করছেন এবং তাঁদের নেতাদের মুক্তির দাবি জানাচ্ছেন। অন্যদিকে, Jantar Mantar-এর প্রতিবাদকারীরা রাতভর ধর্না চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।
বিজেপির পক্ষ থেকে এক প্রতিক্রিয়ায় বলা হয়েছে, "কংগ্রেস বারবার আইন অমান্য করে বিক্ষোভ করছে। সরকার তাঁদের সঙ্গে আলোচনার জন্য সর্বদা প্রস্তুত ছিল, কিন্তু তাঁরা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি করছেন। সংসদে আলোচনার পরিবর্তে রাস্তায় নেমে আসা বিরোধী দলগুলির উদ্দেশ্য স্পষ্ট নয়।" দিল্লি পুলিশের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আইন অনুযায়ী গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং প্রয়োজনে আদালতে পেশ করা হবে নেতাদের। তিনি বলেন, "আমরা কাউকে গ্রেপ্তার করতে চাইনি, কিন্তু আইন ভাঙার কোনও বিকল্প ছিল না।"
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, আজকের এই ঘটনা আগামী দিনের রাজনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। বিরোধী দলগুলি একজোট হয়ে সরকারের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তুলতে পারে। অন্যদিকে, সরকারি সূত্রে জানানো হয়েছে, আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এবং বিরোধীরা আইন নিজের হাতে তুলে নিতে পারে না।
পরিস্থিতি এখনও অস্থির এবং রাজধানীজুড়ে চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছে। আগামী কয়েক ঘন্টায় কী ঘটতে পারে তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে নানা জল্পনা চলছে। তবে কেন্দ্রীয় সরকার স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে রাজধানীতে আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা নিশ্চিত করাই তাদের প্রথম অগ্রাধিকার। দিল্লি পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, যতদিন না পরিস্থিতি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক হচ্ছে, ততদিন অতিরিক্ত বাহিনী মোতায়েন থাকবে এবং কোনও অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলে তাৎক্ষণিক আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।





