এক ফিল্মে নয়, দুই পর্বে 'Ramayana' কাহিনি
নির্মাতা নীতেশ তিওয়ারি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, তাঁর উচ্চাভিলাষী চলচ্চিত্র 'রামায়ণ' কেবল একটি ফিল্মে সমাপ্ত করার মতো গল্প নয়। তাই রণবীর কাপুর ও যশ অভিনীত এই মহাকাব্যিক প্রজেক্টকে শুরু থেকেই দুই পর্বে ভাগ করে পরিকল্পনা করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, এই কাহিনির বিস্তার, চরিত্রের গভীরতা এবং আবেগের স্তর এতটাই ব্যাপক যে, একটিমাত্র ফিল্মে সব কিছু গুছিয়ে বলার চেষ্টা করলে গল্পের ন্যায়বিচার হবে না।
পরিচালকের কথায়, রামায়ণ পার্ট ১ এমন এক জায়গায় শেষ হবে, যেখানে দর্শকদের মনে তীব্র প্রত্যাশা ও কৌতূহল তৈরি হবে থিয়েটার থেকে বেরিয়েই যেন তারা পার্ট ২ দেখতে চাইবেন। সেই কারণেই তিনি প্রথম পর্বের শেষটাকে একটি শক্তিশালী বাহুবলী-স্টাইল ক্লিফহ্যাঙ্গার হিসেবে ডিজাইন করেছেন, যা গল্পের গতি থামিয়ে নয়, বরং আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি রেখে শেষ করবে।
অযোধ্যা বনাম লঙ্কা: আলাদা দুই জগত
প্রজেক্টের সহ প্রযোজক ও রাবণ চরিত্রে অভিনয় করা যশ ইতিমধ্যেই প্রকাশ্যে জানিয়েছেন, প্রথম পর্বে তিনি ও রণবীর কাপুরের চরিত্র রাম এক ফ্রেমে একসঙ্গে দেখা দেবেন না। সিনেমাকন ২০২৬-এ দেওয়া বক্তব্যে যশ বলেন, পার্ট ১-এর ন্যারেটিভ স্ট্রাকচারে অযোধ্যা ও লঙ্কা দু'টি জগতকে আলাদা করে গড়ে তোলা হচ্ছে। রাম নিজের রাজ্যে, রাবণ নিজের সাম্রাজ্যে, ফলে এই পর্বে তাঁদের মুখোমুখি সংঘর্ষ রাখা হয়নি।
বিভিন্ন রিপোর্ট অনুযায়ী, রামায়ণ পার্ট ১-এর সূচনায় রাবণের উত্থান, অর্থাৎ তাঁর চরিত্রের রাইজ আর্ক, এবং অন্যদিকে রামের জীবন, আদর্শ ও অযোধ্যার পরিপ্রেক্ষিতকে বিস্তৃতভাবে তুলে ধরা হবে। যশের স্ক্রিন টাইম এই পর্বে যথেষ্ট ঘণ্টাখানেকের বেশি যা তাঁর চরিত্রের জটিলতা, ক্ষমতা এবং ভবিষ্যতের কনফ্লিক্টের ভিত্তি তৈরি করবে।
কেন দুই ভাগে? পরিচালক নীতেশ তিওয়ারির যুক্তি
আইজিএন-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নীতেশ তিওয়ারি বলেন, "এই গল্পের সামগ্রিক আকার ও আবেগের স্তর এমন যে, স্বাভাবিকভাবেই দুই পর্ব দাবি করে। আমরা খুব সচেতনভাবে ঠিক করেছি, কোন অবস্থানে প্রথম পর্ব শেষ করলে দর্শক সত্যিই পার্ট ২-এর জন্য অপেক্ষা করবেন।"
তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, প্রথম পর্বের শেষটি এমন এক মুহূর্তে থামবে, যাকে সত্যিকারের ক্লিফহ্যাঙ্গার বলা যায় এটি হয়তো রাবণের দ্বারা সীতাহরণের দৃশ্য, বা রামের প্রতিজ্ঞার মুহূর্ত, কিংবা হনুমানের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ এই সম্ভাবনাগুলির মধ্যে যে কোনও একটি শক্তিশালী নাটকীয় বিন্দুতে গল্প আটকে রাখা হবে। যদিও পরিচালক নির্দিষ্টভাবে শেষ দৃশ্যের নাম উল্লেখ করেননি, সোশ্যাল মিডিয়া ও সিনে বিশ্লেষক মহলে প্রবল জল্পনা চলছে যে, সীতাহরণের পর রামের বনবাস থেকে যুদ্ধের পথনকশা তৈরি করাই প্রথম পর্বের উপযুক্ত সমাপ্তি হতে পারে।
রণবীর যশ ফেস-অফ যাবে দ্বিতীয় পর্বে
রামায়ণের মূল কেন্দ্রে থাকা রাম বনাম রাবণ যুদ্ধ, অর্থাৎ দুই বিশ্বের সরাসরি সংঘর্ষ, পুরোপুরি দ্বিতীয় পর্বে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে এ কথা যশ ও নির্মাতারা স্পষ্ট করে দিয়েছেন। ফলে পার্ট ১ থাকবে মূলত চরিত্র নির্ভর, ওয়ার্ল্ড-বিল্ডিংয়ের উপর ভিত্তি করে। অযোধ্যা, লঙ্কা, বনবাস, সম্পর্কের জটিলতা সব কিছু ধীরে ধীরে এস্টাব্লিশ করা হবে।
যশ বলেছেন, "এত বড় গল্পের জন্য দুটি পর্ব দরকার। প্রথম পর্বে রাবণ ও রাম, দু'জনেই নিজেদের রাজ্যে। দ্বিতীয় পর্বেই শুরু হবে তাদের সরাসরি সংঘর্ষ।" এই স্ট্রাকচার নির্মাতাদের মতে, দর্শকের আবেগকে ধাপে ধাপে তৈরি করবে প্রথমে চরিত্রকে চিনিয়ে, পরে দামি সংঘর্ষে নিয়ে যাবে, যাতে ফাইনাল ব্যাটলের ইমপ্যাক্ট আরও বড় হয়।
প্রযোজনা, স্কেল ও মুক্তির পরিকল্পনা
রামায়ণ প্রযোজনা করছে প্রাইম ফোকাস স্টুডিওস, সঙ্গে রয়েছে অস্কারজয়ী ভিএফএক্স স্টুডিও ডিএনইজি এবং যশের মনস্টার মাইন্ড ক্রিয়েশনস। আন্তর্জাতিক রিপোর্ট অনুসারে, এটি ভারতীয় সিনেমার অন্যতম ব্যয়বহুল ও প্রযুক্তিগতভাবে উচ্চমানের প্রজেক্ট হিসেবে পরিকল্পিত, যেখানে আইম্যাক্স ও গ্লোবাল থিয়েট্রিকাল রিলিজের লক্ষ্য মাথায় রেখে কাজ চলছে।
মুক্তির ক্যালেন্ডারও স্পষ্ট: রামায়ণ পার্ট ১ বিশ্বজুড়ে মুক্তি পাবে দিওয়ালি ২০২৬-এ, আর পার্ট ২ আসবে ঠিক এক বছর পরে, দিওয়ালি ২০২৭-এ। এই ফেস্টিভ্যাল রিলিজ কৌশল নির্মাতাদের মতে, আলো অন্ধকারের যুদ্ধ, ন্যায় অন্যায়ের সংঘর্ষ এই মূল থিমের সঙ্গে প্রতীকীভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
ভবিষ্যৎ প্রভাব: ভারতীয় মহাকাব্য থেকে গ্লোবাল এপিক
নীতেশ তিওয়ারির 'রামায়ণ' স্পষ্টতই কেবল একটি পৌরাণিক অভিযোজন নয়, বরং ভারতীয় গল্পকে গ্লোবাল এপিক হিসেবে দাঁড় করানোর প্রচেষ্টা। দুই পর্বে ভাগ করা ন্যারেটিভ স্ট্রাকচার, বাহুবলী-স্টাইল ক্লিফহ্যাঙ্গার, এবং রাম রাবণ সংঘর্ষকে দ্বিতীয় পর্বে রেখে অ্যান্টিসিপেশন তৈরির কৌশল সব মিলিয়ে এটি ভারতীয় ফিল্ম স্টোরিটেলিংয়ে এক নতুন মাইলফলক হতে পারে।
দর্শক ও শিল্প মহলের কৌতূহল এখন মূলত দুটি প্রশ্নে প্রথমত, পার্ট ১-এর সেই নির্দিষ্ট ক্লিফহ্যাঙ্গার মুহূর্ত ঠিক কোথায় রাখা হয়েছে; দ্বিতীয়ত, রাম ও রাবণের বহুমাত্রিক চরিত্র চিত্রণ কতটা ভারসাম্যপূর্ণভাবে পর্দায় ধরা পড়বে। যদি নির্মাতারা চরিত্রের গভীরতা ও ভিজ্যুয়াল স্পেকট্যাকল দুটিকেই সমান গুরুত্ব দিয়ে এই দুই পর্বের এপিককে সার্থক করে তুলতে পারেন, তবে রামায়ণ কেবল বক্স অফিসে নয়, ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসেও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব রেখে যেতে পারে।



