সোমবার সংসদের বাদল অধিবেশনের প্রথম দিনেই রাজধানী দিল্লি কার্যত রণক্ষেত্রে পরিণত হলো। ন্যাশনাল এলিজিবিলিটি টেস্ট (NEET)-সহ বিভিন্ন জাতীয় পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং তার জেরে ছাত্র আত্মহত্যার অভিযোগে সংসদ পর্যন্ত মিছিলের ডাক দিয়েছিল Cockroach Janata Party (CJP)। জন্তর মন্তরে প্রায় দশ হাজার আন্দোলনকারী জড়ো হন, আর সেই বিশাল জমায়েতকে সামলাতে গিয়ে দিল্লি পুলিশকে বাধ্য হয়ে ব্যারিকেড, নিষেধাজ্ঞা এবং শেষমেশ লাঠিচার্জ করতে হয়।
অনশন ভাঙলেন Abhijit Dipke, নেপথ্যে আবেগঘন আবেদন
ঘটনার শুরুটা অবশ্য হয়েছিল কিছুটা আবেগঘন মুহূর্ত দিয়ে। CJP-এর প্রতিষ্ঠাতা Abhijit Dipke বেশ কয়েকদিন ধরে জন্তর মন্তরে অনশনে বসেছিলেন। কিন্তু সোমবার সকালে, মিছিল শুরুর ঠিক আগে তিনি সেই অনশন প্রত্যাহার করে নেন। সরকারি চাপে নয়, বরং NEET পরীক্ষার্থী রিয়া থাপার বাবার অনুরোধে তিনি এই সিদ্ধান্ত নেন। পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগ ঘিরে রিয়া আত্মহত্যা করেছিলেন। পরে সিদ্ধান্ত হয়, Abhijit Dipke নিজেই সংসদমুখী মিছিলের নেতৃত্ব দেবেন, তাই অনশন প্রত্যাহার জরুরি হয়ে পড়েছিল।
নাড্ডার সঙ্গে বৈঠক, তবে শর্ত ছিল আন্দোলনকারীদের
এদিকে কেন্দ্র সরকারও পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় থাকেনি। সকাল থেকেই CJP-এর সঙ্গে আলোচনার বার্তা পাঠায় সরকার। সেই সূত্র ধরেই দলের দুই মুখপাত্র আশুতোষ রাংকা ও সৌরভ দাস বিজেপি সভাপতি তথা কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জে পি নাড্ডার সঙ্গে বৈঠকে যাওয়ার জন্য রওনা দেন।
প্রথমে সরকারের পক্ষ থেকে জেলাশাসক বা সচিব পর্যায়ের আধিকারিকের সঙ্গে আলোচনার প্রস্তাব দেওয়া হলেও আন্দোলনকারীরা তা সরাসরি নাকচ করে দেন। তাঁদের স্পষ্ট বক্তব্য ছিল, হয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নিজে কথা বলবেন, নয়তো অন্তত কোনও ক্যাবিনেট মন্ত্রী। শেষ পর্যন্ত সেই দাবি মেনেই জে পি নাড্ডার সঙ্গে বৈঠকের ব্যবস্থা করা হয়।
মূল দাবি: শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ, পুলিশের কড়া অবস্থান
CJP-এর মূল দাবি ছিল একটাই জাতীয় স্তরের পরীক্ষায় বারবার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ এবং তার জেরে একের পর এক পড়ুয়ার আত্মহত্যার দায় নিয়ে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ।
পুলিশের বক্তব্য ছিল, এই মিছিলের জন্য কোনও অনুমতি নেওয়া হয়নি। তাই সংসদের দিকে এগোনোর যে কোনও চেষ্টাকেই বেআইনি জমায়েত হিসেবে গণ্য করা হবে। নয়াদিল্লি জেলা জুড়ে ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার ১৬৩ ধারায় নিষেধাজ্ঞা জারি ছিল। সংসদ ভবন ও গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠানের চারপাশে মোতায়েন ছিল বিপুল পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনী।
ব্যারিকেড ভাঙার চেষ্টা, খণ্ডযুদ্ধের পরিস্থিতি
তবুও জমায়েত থামেনি। টলস্টয় মার্গ ও সংসদ মার্গের সংযোগস্থলে জড়ো হওয়া আন্দোলনকারীরা একাধিক স্তরের ব্যারিকেড ভাঙার চেষ্টা করেন। কয়েকটি জায়গায় নিরাপত্তা ব্যারিকেড ভেঙে যায়, যার ফলে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে খণ্ডযুদ্ধের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়।
সংবাদ সংস্থা পিটিআই-এর দাবি, রাজীব চক মেট্রো স্টেশনের ভেতরেও CJP সমর্থকদের জমায়েত দেখা যায়। জন্তর মন্তরে ভাষণ দিতে গিয়ে Abhijit Dipke বলেন, গত দশ-বারো বছর ধরে দেশে গণতন্ত্র ধ্বংসের চেষ্টা চলছে। গত এক মাস ধরে জন্তর মন্তরে বসে তাঁরা সেই গণতন্ত্রকে ফিরিয়ে আনার আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন।
PM Monsoon Marathon Yojna pic.twitter.com/NxVJTyG8w0
— Ayushi (@Ayushihihaha) July 20, 2026
ওয়াংচুক থেকে শাবানা আজমি, আন্দোলনে পরিচিত মুখেরাও
আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন একাধিক পরিচিত মুখ। জলবায়ু ও শিক্ষা আন্দোলনকারী সোনম ওয়াংচুক জন্তর মন্তরে অনশনরত অবস্থায় ছিলেন। পরে তাঁকে সফদরজং হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
সোমবার সকালে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে হাতে লেখা চিঠিতে তিনি জানান, শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল থাকায় তাঁকে সাময়িকভাবে ছেড়ে দেওয়া হোক, যাতে তিনি সংসদমুখী মিছিলে অংশ নিতে পারেন।
অন্যদিকে অভিনেত্রী শাবানা আজমি ও অভিনেতা প্রকাশ রাজ সরাসরি জন্তর মন্তরে এসে আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানান। তাঁদের পাশাপাশি সাংসদ মনোজ ঝা ও রাজারাম সিং-সহ একটি প্রতিনিধি দলের অনুরোধে আইসা কর্মী নেহা, মণীশ ও আমিনও নিজেদের অনশন প্রত্যাহার করেন।
রাজনৈতিক সমর্থন, মুলতুবি হলো সংসদ অধিবেশন
রাজনৈতিক সমর্থনও এসেছে বিভিন্ন দিক থেকে। সমাজবাদী পার্টির সাংসদ ডিম্পল যাদব দলের নেতাদের নিয়ে সংসদ ভবন থেকে সরাসরি জন্তর মন্তর পর্যন্ত পদযাত্রা করে আন্দোলনকারীদের প্রতি সংহতি জানান।
এই পুরো ঘটনাপ্রবাহের মধ্যেই সোমবার লোকসভা ও রাজ্যসভা উভয় কক্ষের অধিবেশন বেলা দুটো পর্যন্ত মুলতুবি হয়ে যায়।
শেষে CJP-এর মুখপাত্র আশুতোষ রাংকা জন্তর মন্তরে উপস্থিত আন্দোলনকারীদের উদ্দেশে জানান, খুব শীঘ্রই আন্দোলনের পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। তাঁর দাবি, সরকার ইতিমধ্যেই যথেষ্ট চাপে রয়েছে।
এখন সবার নজর জে পি নাড্ডা ও CJP-এর বৈঠকের দিকে। আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ বের হবে, নাকি আন্দোলন আরও দীর্ঘায়িত হবে সেটাই এখন দেখার।





